ব্রিজিত-ম্যাখোঁর নাটকের ক্লাসের দিনগুলি

ব্রিজিত-ম্যাখোঁর নাটকের ক্লাসের দিনগুলি

একসময় যার নাটকের শিক্ষিকা ছিলেন, এখন তাঁরই ফার্স্ট লেডি হলেন। আলোচিত এই নারী হলেন ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়া ইমানুয়েল ম্যাখোঁর স্ত্রী ব্রিজিত থনিও। স্বামীর চেয়ে ২৫ বছরের বড় ব্রিজিত ইতিমধ্যে গণমাধ্যমের নজর কেড়েছেন। সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি আলোচনায় থাকবেন বলে আজ সোমবার এএফপির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩৯ বছর বয়সী মধ্যপন্থী নেতা ইমানুয়েল ও ৬৪ বছর বয়সী ব্রিজিতের প্রেমকাহিনি জানতে হলে যেতে হবে একটু পেছনে। ১৭ বছর বয়সে ইমানুয়েল প্রেমে পড়েন তার নাটকের শিক্ষিকা ব্রিজিতের। সাহস দেখিয়ে সে কথা জানিয়ে দেন তাঁকে। বলেন, ‘আমি তোমাকে একদিন বিয়ে করব, দেখো।’ বিবাহিত আর তিন সন্তানের জননীর প্রেমে পড়ে ছেলের হাবুডুবু খাওয়ার এমন দশা মানতে পারেননি ইমানুয়েলের বাবা-মা। ছেলের কাছ থেকে দূরে থাকার আরজি নিয়ে বাবা-মা হাজির হয়েছিলেন সেই নাটকের শিক্ষিকার দরবারে। তবে তিনি তখন তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারেননি; বরং কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না।’তবে কী তখনই ছাত্রের প্রেমে মজেছিলেন ব্রিজিত! সে উত্তর অবশ্য জানা যায়নি। কারণ, তাদের দুজনের কেউই সে ব্যাপারে কোনো দিন মুখ খুলবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। ব্রিজিতের ভাষায়, ‘কেউ কোনো দিন জানবে না, কখন থেকে আমাদের গল্প একটি প্রেমের গল্পে পরিণত হয়েছে। এটা শুধুই আমাদের। আর এটাই আমাদের গোপন রহস্য।’ ইমানুয়েল ছোটবেলার প্রতিজ্ঞা রেখেছেন। বয়সের ২৫ বছরের ব্যবধান অগ্রাহ্য করে ২০০৭ সালে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন ইমানুয়েল-ব্রিজিত।

ফ্রান্সে ফার্স্ট লেডির আনুষ্ঠানিক কোনো ভূমিকা নেই। তবে ইমানুয়েল তাঁর স্ত্রীকে ফার্স্ট লেডি হিসেবে একটু অন্যভাবে মূল্যায়ন করবেন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। রুচিশীল আর মার্জিত ব্যক্তিত্বের ব্রিজিত ইমানুয়েলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাঁর ভূমিকাও তাই সেভাবেই নির্ধারিত হবে। ইমানুয়েল ম্যাখোঁর প্রশাসনে ফার্স্ট লেডির ভূমিকা কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে গত বছর ব্রিজিতের দেওয়া এক সাক্ষাৎকার থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ব্রিজিত তখন বলেছিলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে আমি তরুণদের জানি। তাই আমার লড়াইটা হবে শিক্ষা বিষয়ে।’ব্রিজিতের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৩ এপ্রিল। তিনি শিক্ষিকা হিসেবে ফরাসি ও লাতিন ভাষা শেখানোর পাশাপাশি নাটকের ক্লাসও নিতেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে মিলান কুন্ডেরার ‘জ্যাক অ্যান্ড হিস মাস্টার’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে ওই নাটকের নির্দেশক ব্রিজিতের প্রেমে পড়েন ইমানুয়েল। এরপর অভিনেতা-নির্দেশক হয়ে ওঠেন বাস্তব জীবনের চিত্রনাট্যের নায়ক-নায়িকা।

ইমানুয়েল-ব্রিজিত যখন বিয়ে করেন, তখন ইমানুয়েলের বয়স ২৯ বছর। তিনি নিজের পড়াশোনাটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর ব্রিজিত কাজ করছিলেন শিক্ষক হিসেবে। এক তথ্যচিত্রে ব্রিজিত বলেন, ‘আমি যখন কোনো কিছুর জন্য মনস্থির করি, আমি সেটা করি।’ ভালোবাসা প্রমাণের দৌড়ে এগিয়ে থাকা ইমানুয়েল তাঁর স্ত্রীর সম্পর্কে বলেন, ‘আমার যা আছে সেটার জন্য সে আমাকে ভালোবাসেনি, বরং যে ভালোলাগা-ভালোবাসা আমি তাঁকে দিয়েছি সেটার জন্য সে আমাকে ভালোবেসেছে। আমার জন্য সে সব ছেড়েছে।’কাছের মানুষের কাছে ব্রিজিত ‘বিবি’ নামে পরিচিত। ঘনিষ্ঠরা এই ফার্স্ট লেডিকে আন্তরিক, অমায়িক ও শিক্ষিত বলে জানেন। দ্বিতীয় স্বামী আর প্রথম সংসারের তিন সন্তানকে নিয়ে সুন্দর পারিবারিক জীবন কাটাতে ভীষণ পছন্দ করেন তিনি। তাঁর বড় ছেলে প্রকৌশলী এবং দুই মেয়ের একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী। নিজের জীবনে তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রভাব বরাবরই স্বীকার করেছেন ইমানুয়েল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরও তাই বললেন, বরাবরের মতো পাশে থেকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাবেন ব্রিজিত—এটা তাঁর বিশ্বাস। কিশোর বয়সে নাটক করতে গিয়ে যার নির্দেশনা মেনেছিলেন, পরিণত বয়সে তা না মেনে কি পারবেন?

Share Button