ডিভোর্সের আগে মনে হতো শ্বশুরবাড়িটা যেন এক জেলখানা। আজ, ডিভোর্সের তিন বছর পর, নিজের বাড়িটাই আমার কাছে নরকের মতো লাগে।
আমি জানি না কেন লিখছি—হয়তো এই আশায়, যেন আর কোনো মেয়ে আমার মতো ভুল না করে। যেন রাগের মাথায়, জেদের চোটে কারো সংসার না ভাঙে।
আমার নামটা গোপনই থাকুক। বয়স এখন বাইশ। বিয়ের সময় ছিল মাত্র ঊনিশ। নিজের পছন্দেই বিয়ে করেছিলাম—আমার স্বামী, শান্ত-স্বভাব, কাজের মানুষ। ছোটখাটো জেদ ছিল, কিন্তু খারাপ ছিল না মোটেই।
সংসার চলল প্রায় আড়াই বছর। আমাদের একরত্তি ছেলে তখন এক বছরের।
বিয়ের পর প্রথম দিকে খুব সুন্দরই চলছিল সব। কিন্তু আমি ছিলাম বেশ আবেগপ্রবণ, একটু রাগীও বটে। সামান্য কথাতেই মন খারাপ হয়ে যেত, আর একটু ঝগড়া হলেই ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে আসতাম।
সেই সময় আমার দিদি, মামা, ভাইরা সবাই আমার পাশে দাঁড়াত—ওদের কাছে নিজের কষ্টগুলো খুলে বলতাম, কিন্তু নিজের ভুলের কথা বলতাম না কখনো। সবাই স্বামীকে দোষারোপ করত, আর আমিও ভাবতাম—আমি তো কিছুই ভুল করিনি!
একদিন তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে আমাদের প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধে। কথার পর কথায় আমি এমন সব কথা বলেছিলাম, যেগুলো কোনো স্ত্রীকেই স্বামীর প্রতি বলা উচিত নয়। রাগে উত্তেজনায় ওর সহ্যশক্তি ভেঙে যায়, আর ও এক চড় মেরে বসে।
ওই একটা চড়ই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমি বাপের বাড়ি ফিরে আসি। নিজের দোষের দিকটা লুকিয়ে সবার কাছে কেঁদেকেটে শুধু ওর দোষটাই বললাম। পরিবার বলল—“ওর সঙ্গে আর থাকা উচিত না, মামলা কর।”
আমি ওর নামে নারী নির্যাতনের মামলা করলাম। পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে গেল। ওর বাবা-মা বারবার এসে অনুরোধ করলেন, যেন আমি মামলা তুলে নিই।
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবতাম, সত্যিই কি ও এত খারাপ? ও তো সঙ্গে সঙ্গে হাত জোড় করে ক্ষমাও চেয়েছিল। আমি যদি তখন একটু ধৈর্য ধরতাম!
শেষমেশ মামলা তুলে নিলাম, কিন্তু ওর কাছে ফেরত গেলাম না। কিছুদিন পর দুই পরিবারের মধ্যে মিটমাটের চেষ্টা হল, সবাই বলল নতুন করে শুরু করতে। আমিও রাজি হলাম।
প্রথম কিছু মাস সব ঠিকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন আবার ঝগড়া—আর আমি ফের বাপের বাড়ি। ও অসুস্থ, শুনেও যাইনি। বাড়ির সবাই বলল, ওর অসুস্থতা নাকি নাটক। ওর আত্মীয়রা আসুক, ওরা ক্ষমা চাইবে—তবেই আমি যাব!
কিন্তু কেউ এল না। তার বদলে এলো একটা চিঠি—ডিভোর্স লেটার।
চিঠিটা হাতে পেয়েই আমার ভেতরটা জ্বলে গেল। ভাবলাম, এ কী সাহস! আমি নিজে কত কষ্ট পেয়েছি, আর ও আমাকে ত্যাগ করছে!
তখন আমি ঠিক করলাম, এবার আমিই শেষ কথা বলব। আদালতে গিয়ে মাসিক খরচ, ভরণপোষণ—সবকিছুর জন্য বিশাল অঙ্ক দাবি করলাম। ভাবলাম, ওর যেন নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
কিন্তু ও একটাও কথা না বলে সব মেনে নিল।
আমার হাতে এল সন্তান, আর্থিক নিরাপত্তা—আর ওর হাতে এল স্বাধীনতা।
আজ সাড়ে তিন বছর কেটে গেছে। শুনেছি, ও আবার বিয়ে করেছে, বেশ ভালোও আছে। আর আমি?
আমার জীবন যেন থমকে গেছে। রাতে ছেলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি—একটা ভুল, একটুখানি জেদ, এক মুহূর্তের রাগ কীভাবে একটা পুরো সংসার শেষ করে দিল!
ও আমাকে একবার মেরেছিল, কিন্তু আমি ওকে কথায়, অহংকারে, অভিমানে অজস্রবার আঘাত করেছি।
আজ বুঝি, সংসার মানে ক্ষমা করা, মানিয়ে নেওয়া, ভালোবাসার মধ্যে ছোট হয়ে যাওয়া।
বড় হয়ে গেলে সংসার টেকে না, টেকে না মনের টান।
যারা ভাবছেন, ডিভোর্স মানে মুক্তি—না, মুক্তি নয়, সেটা এক ধরণের নিঃসঙ্গ কারাবাস।
যখন চারপাশে সবার সংসার, হাসিখুশি জীবন, তখন নিজের একলা ঘরটা সত্যি দম বন্ধ করা নরকের মতো লাগে।
আমার শুধু এতটাই বলার আছে—বোনেরা, স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হতেই পারে, কিন্তু রাগের মাথায় “ডিভোর্স দাও” কথাটা মুখে আনবেন না।
একটু নরম হোন, একটুখানি ছাড় দিন, হয়তো তাতেই আপনার পুরো জীবন বদলে যাবে।
© Bong Bulletin
Priyo Bangla 24 – Most Popular Bangla News The Fastest Growing Bangla News Portal Titled Priyo Bangla 24 Offers To Know Latest National And Local Stories.