চেন্নাই শহরের প্রখ্যাত শিল্পপতি সুধীর চৌধুরী আজ হাসপাতালের বেডে মৃ’ত্যুর মুখে শুয়ে আছেন। তাঁর হার্টে এমন জটিল ব্লকেজ ধরা পড়েছে, যা আর কোনো অপারেশনেই সারানো সম্ভব নয়। দেশের নামজাদা হার্ট স্পেশালিস্টরা মিলে বোর্ড মিটিংয়ে বসে শেষ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন— “রোগীকে বাঁচানো আর সম্ভব নয়।”
মিটিং চলাকালীন একজন তরুণ ডাক্তার হঠাৎ বললেন, “লন্ডনে এক বাঙালি সার্জন আছেন— ডা. মৌমিতা রায়। তিনি এমন অনেক অসম্ভব কেস সফলভাবে করেছেন। যদি ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, হয়তো একটা উপায় বেরোবে।”
বোর্ডের প্রধান ডাক্তার স’ঙ্গে স’ঙ্গে বললেন, “তাহলে এখনই ওনার স’ঙ্গে কথা বলুন।”
লন্ডনের ঝলমলে শহরে, এক নিরিবিলি অফিসরুমে বসে ল্যাপটপে রিপোর্ট লিখছিলেন ডা. মৌমিতা রায়। এমন সময় মেইল এল— ভারতে এক রোগীর রিপোর্ট। মেইল খুলে দেখে চোখ কপালে— হার্টে একেবারে শেষ স্তরের ব্লকেজ। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখে ফেললেন, “এই কেস অপারেশনের বাইরে। রোগীকে বাঁচানো সম্ভব নয়।”
কিন্তু সেন্ড বাটনে চাপতে গিয়ে চোখ পড়ল রোগীর নামের দিকে— “সুধীর চৌধুরী।” কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইলেন তিনি। তারপর সব লেখা মুছে দিয়ে নতুন করে টাইপ করলেন, “রোগীর পারিবারিক তথ্য ও সাম্প্রতিক ছবি পাঠানোর অনুরোধ রইল।” অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই চেন্নাই থেকে ছবিসহ রিপোর্ট চলে এল। ছবিটা খুলে দেখা মাত্রই তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
এরপর তিনি উত্তর দিলেন, “আমি নিজে এই অপারেশন করব। আগামীকালই ভারতে রওনা দিচ্ছি।”
নিজের হাসপাতালকে ইমেল পাঠিয়ে জরুরি ছুটির আবেদন করলেন। রাতেই ফ্লাইটের টিকিট বুক করে নিলেন, আর ব্যাগে কিছু চিকিৎসা সম্পর্কিত বই রেখে একমনে পড়তে শুরু করলেন।
কলকাতার উপকণ্ঠে ছোট্ট এক বাড়িতে একা থাকেন মৌমিতার মা, সরোজিনী দেবী। বহুবার মেয়ে বলেছে— “মা, আমার সঙ্গে লন্ডনে চলবে?” কিন্তু মা একরোখা স্বভাবের— “না মা, আমার দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।”
সারাদিন বাগানের গাছপালা আর ফুল নিয়েই সময় কাটান তিনি। একদিন বাগানের চেয়ারে বসে ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ পিছন থেকে কেউ এসে চোখ দুটো ঢেকে দিল।
সরোজিনী দেবী হাসতে হাসতে বললেন, “কে রে? মৌমিতা না কি?”
মেয়ে হেসে জড়িয়ে ধরল, “তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে হঠাৎ চলে এলাম মা, কিন্তু আবার একটু পরে বেরোতে হবে।” মা মৃদু গলায় বললেন, “তুইই তো আমার সেরা উপহার রে মা, আর কিছুই লাগে না আমার।” মৌমিতা তখন চোখ মুছে বলল, “আমাকে আশীর্বাদ করো মা, যেন আমি আজ যা করতে যাচ্ছি তাতে তোমার মুখ উজ্জ্বল হয়।”
তারপরই গাড়ি ছুটল চেন্নাইয়ের পথে। হাসপাতালে পৌঁছে অন্যান্য ডাক্তারদের সঙ্গে বোর্ড মিটিংয়ে বসে তিনি জানালেন— “অপারেশন আমি করব।” সবাই জানে, এটা প্রায় অসম্ভব কেস। তবুও তিনি রাজি হলেন। সুধীরবাবুর পরিবার চোখে জল নিয়ে বন্ডপেপারে সই করল— “শেষ চেষ্টা করুন, দয়া করে।” পরদিন সকাল। ঘড়িতে বাজে ঠিক দশটা সাত। অপারেশন শুরু। টানা পাঁচবার চেষ্টার পরও কোনো সাড়া নেই। ক্লান্ত হয়ে মৌমিতা হঠাৎ মাথা ধরে কেঁদে উঠলেন— “মা গো!”
পুরো অপারেশন থিয়েটার নিস্তব্ধ।
কিন্তু মুহূর্ত খানেক পর মনিটরে হালকা আলো জ্বলে উঠল— হার্ট আবার স্পন্দন শুরু করেছে! সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “অপারেশন সফল!” সুধীরবাবু জ্ঞান ফিরে ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। এক ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন, “ধন্যবাদটা আমাদের নয়, যিনি বিদেশ থেকে এসেছেন তাঁকেই দিন।”
চোখ তুলে সুধীরবাবু দেখলেন, সামনে দাঁড়িয়ে ডা. মৌমিতা রায়।
সুধীরবাবু আবেগে কাঁপা গলায় বললেন, “আপনি মানুষ নন, আপনি ঈশ্বরের দূত। আপনি আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিলেন। আপনার বাবা-মা কত গর্বিত নিশ্চয়ই।” মৌমিতা শান্ত গলায় বললেন, “যদি বলি সেই গর্ব করার মানুষ আপনিই?” সুধীরবাবু হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মানে?” মৌমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “স্মৃতি নামের এক মেয়েকে চিনতেন তো আপনি? যাকে একসময় ভালোবাসার নামে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারপর একদিন একা ফেলে দিয়েছিলেন যখন সে আপনার সন্তানের মা হতে চলেছিল।”
সুধীরবাবুর মুখ ফ্যাকাশে। মৌমিতা স্থির গলায় বললেন, “আপনি তখন আমার মাকে বলেছিলেন সন্তানকে শেষ করে দিতে। কিন্তু মা পারেননি। কারণ সেই সন্তান আমি। আজ আমি আপনাকে জীবন দিলাম, যেদিন আপনি আমাকে মরতে দিয়েছিলেন।” চোখে জল নিয়ে মৌমিতা আরও বললেন, “আমি আপনার মেয়ে— কিন্তু শুধু সেই সম্পর্কেই আসিনি। আমি এসেছি আমার মায়ের ভালোবাসাকে জীবন্ত রাখতে। আজ মা এখনো আপনার নামের সিঁদুর পরে। আমি চাই না সেই সিঁদুর কোনোদিন মুছে যাক। এই জীবন বাঁচানোই হলো আমার মায়ের প্রতি দেওয়া— ‘সবচেয়ে বড় উপহার।’”
Priyo Bangla 24 – Most Popular Bangla News The Fastest Growing Bangla News Portal Titled Priyo Bangla 24 Offers To Know Latest National And Local Stories.