প্রেমিকের শর্ত কাজ ছাড়ার, তাই শাখা ছেড়ে লাঠি নিয়ে সামলাচ্ছেন শ্বশান

২৯ বছর বয়সটা তো রঙিন হওয়ার কথা ছিল। হাতে শাঁখা-পলা, কপালে সিঁদুর আর ঘরভর্তি সংসার থাকার কথা ছিল। কিন্তু ওসব কপালে জোটেনি বারুইপুরের টুম্পা দাসের। তাঁর কপালে জুটেছে শ্মশানের ছাই আর চিতার আগুন।

​ইনি টুম্পা দাস। পশ্চিমবঙ্গের বুকে এক জীবন্ত দুর্গা। শুনতে অবাক লাগছে? ভাবছেন, যে কাজ করতে পুরুষদেরও বুক কাঁপে, সেই মরা পোড়ানোর কাজ করছেন এক নারী? হ্যাঁ, পেটের দায় বড় দায়। খিদে আর দায়িত্ববোধ মানুষকে সব শিখিয়ে দেয়।

​গল্পটা খুব একটা সহজ ছিল না। ২০১৪ সাল। হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল ১৯ বছরের মেয়েটার। ঘরে বিধবা মা, ছোট বোন আর ভাই। নার্সিংয়ের আয়ার কাজ করে যা পেতেন, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তাই বাধ্য হয়েই বাবার ফেলে যাওয়া বাঁশের লাঠিটা নিজের হাতে তুলে নিলেন টুম্পা। বেছে নিলেন শ্মশানের ডোম হওয়ার কঠিন জীবন।

​লোকে ছি-ছি করেছে। বলেছে, “মেয়েছেলে হয়ে মরা পোড়াবি? ভূত-প্রেতের ভয় নেই?” প্রেম এসেছিল জীবনে, স্বপ্ন দেখেছিলাম ঘর বাঁধার। কিন্তু প্রেমিকের পরিবার যখন শুনল হবু বউ শ্মশানে মরা পোড়ায়, তখন তারাও মুখ ফিরিয়ে নিল। শর্ত দিল—কাজ ছাড়লে তবেই বিয়ে হবে।

​কিন্তু টুম্পা হার মানেননি। চোখের জল মুছে বলেছিলেন, “বিয়ে না হলে জীবন চলে যাবে, কিন্তু কাজ না করলে মা-ভাই না খেয়ে মরবে।” সেই যে লাঠি ধরলেন, গত ১০ বছরে আর থামেননি।

​আজ তিনি বারুইপুরের শ্মশানের একচ্ছত্র অভিভাবক। রাত-বিরেতে যখন আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, টুম্পা তখন একা হাতে লাঠি নিয়ে সামলাচ্ছেন মদ্যপদের উৎপাত, আবার কখনও চোখের জল চেপে দাহ করছেন কোনো একরত্তি শিশুর দেহ। বলেন, “বাচ্চাদের পোড়াতে গেলে বুকটা ফেটে যায়। মনে হয়, আমারও তো একটা সংসার হতে পারত…”

​মাস গেলে সামান্য কয়েক হাজার টাকা বেতন। কিন্তু এই সামান্য টাকাতেই তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁর পরিবারকে, মানুষের শেষযাত্রাকে করেছেন সুগম। সমাজের চোখে কাজটা ‘অস্পৃশ্য’ হতে পারে, কিন্তু টুম্পার এই লড়াইটা
​যে সমাজ মেয়েদের ‘অবলা’ ভাবে, সেই সমাজের গালে সপাটে চড় মেরে টুম্পা প্রমাণ করে দিয়েছেন—নারীরাও পারে, সব পারে।
​স্যালুট জানাই এই রিয়েল লাইফ হিরোকে। টুম্পা দাসের এই হার না মানা লড়াই নিয়ে আপনার কী মতামত? কমেন্টে জানান।