“এই যে! ডিভোর্স তো হলো, এখন বাপের বাড়িতেই থাকবে বুঝি?”

আদালতের ঘরে শেষ কাগজে সই পড়তেই আইনজীবী হালকা হাসি দিয়ে বলেছিলেন—
“এই তো ম্যাডাম, সব শেষ। আইনি বিচ্ছেদ হয়ে গেল।
ত্রিশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মিলেছে, মাসে কুড়ি হাজার খরচাও চলবে।
এবার নিশ্চয়ই স্বস্তি?”

কবিতা খুব অল্প করে হেসে বলেছিল—
“হ্যাঁ… এখন আর কারও কাছে কিছু চাইবার নেই।”

আইনজীবী নথি গুছিয়ে নিলেন।
আর কবিতা, বাবা-মায়ের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল।

আদালতের এক কোণে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল নির্বাণ।
কবিতা একবারও পিছনে তাকাল না।
গাড়ির দরজা বন্ধ হল—
একটা সম্পর্কও চুপচাপ বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথম মাস—
মায়ের বাড়িতে সবাই খুব যত্ন নিল।
মা বারবার জিজ্ঞেস করত, ঠিক আছিস তো?
বাবা চুপচাপ পাশে বসে থাকত।
কবিতার মনে হয়েছিল—
এই তো বুঝি স্বাধীনতা, এই তো শান্তি।

দ্বিতীয় মাস—
বাড়ির কথাবার্তার সুর বদলাতে শুরু করল।
দাদা মাঝে মাঝে একটু কড়া গলায় বলত,
“সারাদিন ঘরে বসে থাকলে তো চলবে না।”
বৌদি ঠান্ডা গলায় খোঁচা দিত,
“এত বড় হয়ে গেছিস, একটু দায়িত্ব নিলে ভালো হয় না?”
ভাইপো হেসে হেসে একদিন বলে ফেলল,
“পিসি, তুমি কবে নিজের বাড়ি যাবে?”

তৃতীয় মাস—
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
যেখানে আগে আদর ছিল, সেখানে এখন অস্বস্তি।
কবিতা কথা কমিয়ে দিল,
কিন্তু বুকের ভেতর জমে উঠছিল অদ্ভুত এক চাপা কষ্ট।

চতুর্থ মাস—
তার ওঠাবসা নিয়েই যেন নজর।
বাইরে পা রাখলেই পাড়ার ফিসফাস কানে আসে—
“ওই যে, ডিভোর্স হয়েছে… এখন বাপের বাড়িতেই থাকবে বুঝি!”

সেই প্রথম কবিতা বুঝতে পারল—
শ্বশুরবাড়িতে সম্পর্ক জটিল ছিল,
কিন্তু সেটা ছিল তার নিজের সংসার।
আর এখানে—
সে যেন না অতিথি, না গৃহকর্ত্রী;
অকারণ এক বোঝা।

এক রাতে ছাদের কোণে বসে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
টাকা আছে, স্বাধীনতা আছে—
কিন্তু সম্মান, আপন ভাব, একটা ঘরের নিশ্চয়তা কি সত্যিই আছে?

নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলেছিল—
“আমি ভুল করেছি…
রাগ আর কষ্টে শুধু যন্ত্রণাটাই দেখেছিলাম,
ভবিষ্যতের দিকটা ভাবিনি।”

সে বুঝে গেল—
ভাঙা সম্পর্কের পর একজন মেয়ের সবচেয়ে বেশি দরকার ভরসা।
কিন্তু সমাজ আগে বিচার করে,
আর মায়ের বাড়ি—
যাকে সে নিজের ভাবত,
সেখানেই অধিকারটা সবচেয়ে কম।

চোখ ভিজে উঠেছিল তার।
এখন সে নিজের সিদ্ধান্তের দাম বুঝতে পারছিল।
প্রতিদিন একই প্রশ্ন তাড়া করত—
আমি কী হারালাম?
রাগের বশে কি সবটা নষ্ট করে ফেললাম?

ছাদে বসে নির্বাণের কথা মনে পড়ত।
তার অভ্যাস, ছোটখাটো তর্ক,
আর সবকিছুর শেষে যে মানুষটা পাশে থাকত—
সেই উপস্থিতিটাই আজ সবচেয়ে দূরে।

এক রাতে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
কাঁপা হাতে ফোন তুলে নম্বর ডায়াল করল।

কল ধরতেই শোনা গেল—
“হ্যালো?”

কবিতা ধীরে বলল,
“নির্বাণ…
আমরা কি আবার চেষ্টা করতে পারি?
আমি তোমাকে খুব মিস করছি।
আমি… আবার তোমার সঙ্গে থাকতে চাই।”

দু’দিকেই কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর গভীর নিশ্বাস নিয়ে নির্বাণ বলল—
“আমি নিজেও পারছি না তোমাকে ছাড়া।
ভুল দু’জনেরই ছিল।
যদি ঠিক করতে চাই, দু’জনকেই এগোতে হবে।
আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনতে চাই…
তবে কিছু বদল আমাদের দু’জনেরই দরকার।
তুমি রাজি থাকলে—
আমি এখনই রওনা দিচ্ছি।”

কবিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
খুব আস্তে বলল—
“হ্যাঁ… আমি প্রস্তুত।”

ঘড়িতে তখন রাত বারোটা।
নির্বাণ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
শীতের রাস্তা ফাঁকা,
কিন্তু তার মনে একটাই কথা—
ওকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে হবে।

পাঁচ ঘণ্টা একটানা ড্রাইভ।
ভোরের আলো ফোটার সময়
সে কবিতার বাবার বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে।

কবিতা বাইরে এল।
চোখে লজ্জা, ভয় আর স্বস্তির মিশেল।

বাবা-মা দরজা খুললেন।
নির্বাণ মাথা নিচু করে প্রণাম করল।
কবিতা ছোট্ট ব্যাগটা তুলে নিল।
কোনও কথা দরকার পড়ল না—
দু’জনেই বুঝে গিয়েছিল,
এই সিদ্ধান্তটা মন থেকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি চলল।
কবিতা ফিরছিল তার নিজের ঘরে—
যে ঘরটা সে একদিন তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে এসেছিল।

সম্পর্ক আসলে ভেঙে যায় না।
মাঝে মাঝে শুধু ভুল বোঝাবুঝির ধোঁয়াটা পরিষ্কার করতে হয়।
সময়মতো একটু নত হওয়া—
পুরো জীবনটাকেই বাঁচিয়ে দিতে পারে।