হাতে লিখে প্রকাশ করেন পত্রিকা, সম্পাদক দিনমজুর হাসান পারভেজ

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম সোনাতলা গ্রামের হাসান পারভেজ (৩৯)। কখনো ইটভাটায় কাজ করে, কখনো নদীতে মাছ ধরে, আবার কখনো খেতখামারে দিনমজুরি করে সংসার চালান তিনি। এ ছাড়াও আরও অনেক পরিচয় আছে তার। তিনি একাধারে সংবাদপত্রের সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকাশক।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে হাতে লিখে চার পৃষ্ঠার একটি পত্রিকা বের করেন হাসান পারভেজ। পত্রিকার নাম আন্ধারমানিক। তাতে উঠে আসে স্থানীয় মানুষের জীবনকথা। মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও সাফল্যের কথা প্রকাশিত হয় পত্রিকায়। এ পত্রিকা প্রকাশের পেছনে আরও একটি কারণ হল কবিতা লেখে প্রকাশ। কবিতা লেখে কোথাও প্রকাশ করতে না পেরে এই উদ্যোগ নেন হাসান পারভেজ।

হাসান পারভেজ গণমাধ্যমকে জানান, কোথাও আমার কবিতা ছাপাতে পারিনি। তাই ভাবলাম পত্রিকা বের করলে কবিতাও ছাপাতে পারব এবং মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথাও তুলে ধরতে পারব। যে চিন্তা সেই কাজ। ২০১৯ সালের ১ মে থেকে আন্ধারমানিক পত্রিকা বের হচ্ছে, যা এখনো চলমান রয়েছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পশ্চিম সোনাতলায় হাতে লেখে বের হয় আন্ধারমানিক পত্রিকাটি। নিজ হাতে খবর লেখার দুরূহ কাজটি করেন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হাসান পারভেজ।

১৯৯৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও অর্থের অভাবে দিতে পারেননি হাসান পারভেজ। পরে ২০১৫ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন তিনি। ২০১৭ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি (ভোকেশনাল) পাস করেন তিনি। এখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকও করতে চান হাসান পারভেজ।

হাসান পারভেজ সাংবাদিকদের জানান, পত্রিকাটি শুরুতে শুধু পশ্চিম সোনাতলা গ্রামের মানুষকে পড়াতে চেষ্টা করেছি। এখন পাশের আদমপুর, ফতেহপুর, হোসেনপুর, চাঁদপাড়া, নিজকাটা ও টুঙ্গিবাড়িয়া গ্রামের মানুষও আমার হাতে লেখা পত্রিকা পড়েন। আমার সঙ্গে ১৫ জনের মতো লোক কাজ করেন। বলতে পারেন, তারাই আমার সংবাদকর্মী। কেউ কাঠমিস্ত্রি, কেউ দর্জি, কেউ কৃষক, কেউ শ্রমজীবী, কেউ গৃহিণী। গ্রামে তাদের চোখে পড়া ঘটনা আমাকে বলেন। পরে আমি লিখে দিই। তবে তারা কেউ টাকা নেন না।

তিনি আরও জানান, দুই মাস পরপর আমার পত্রিকা বের হয়। প্রতিটি প্রতিবেদন আমি পত্রিকায় নিজের হাতে লিখি। শুধু শিরোনামগুলো কম্পিউটারে কম্পোজ করে দিই। পত্রিকা হাতে লেখার পর আমি মূল কপির ২০০ থেকে ২৫০টি ফটোকপি করি। অর্থ সংকটসহ নানান কারণে কয়েকটি সংখ্যা বের করতে পারিনি। একটি ফটোকপি মেশিন, ছবি তোলার জন্য একটি ক্যামেরা অথবা মোবাইল ফোন ও একটি কম্পিউটার থাকলে কাজটি সহজ হতো।

হাসান পারভেজ জানান, প্রতিটি কপির জন্য খরচ হয় ৭ টাকা। এক সংখ্যা প্রকাশ করতে ১৪০০ থেকে ১৭৫০ টাকা ব্যয় হয়। একেকটি পত্রিকার দাম ১০ টাকা। সব কপি বিক্রি করা গেলে ৫০০ টাকার মতো লাভ থাকে।

তিনি জানান, রুবিনা নামের ৯ বছরের একটি মেয়েকে নিয়ে লিখেছিলাম। তার মা ডলি বেগমকে পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হতো। কারণ তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র। তাদের দুঃখ-কষ্টের জীবন পত্রিকায় তুলে ধরি। পরে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ওই পরিবারকে একটি ঘর ও দুই শতাংশ জমি দিয়েছে। আমি গ্রামের মানুষের সাফল্যের খবর আমার আন্ধারমানিক পত্রিকায় বেশি প্রকাশ করি।

তিনি আরও জানান, পত্রিকা বের করি মনের আনন্দে। সংসার চলে কাজ করে। বলতে লজ্জা নেই, আমি কখনো ইটভাটায় কাজ করি। কখনো নদীতে মাছ ধরি, কখনো গ্রামের অবস্থাশালী পরিবারের গৃহস্থালির কাজ করি এবং খেতখামারের কাজ করি। যত দিন পারি আমার নিজ হাতে লিখেই পত্রিকা বের করব। তবে পৃষ্ঠা বাড়ানোর ইচ্ছা আছে। এখন আমি নিজ ঘরের বারান্দাকে কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছি। আলাদা একটি অফিস নিতে চাই।

সরকার কিংবা সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতা করলে পত্রিকাটি মাসিক করতে পারতেন জানিয়ে হাসান পারভেজ সাংবাদিকদের বলেন, তাহলে দেশ ও মানুষের জন্য লেখতে পারতাম।


Discover more from Priyo Bangla 24 - Most Popular Bangla News

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About প্রিয় বাংলা ২৪

প্রিয় বাংলা ২৪ একটি দ্রুত বর্ধনশীল বাংলা নিউজ পোর্টাল, যা জাতীয় ও স্থানীয় সর্বশেষ খবর, প্রযুক্তি বিষয়ক টিপস এবং শিক্ষামূলক কনটেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ ও তথ্য সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং পাঠকবান্ধবভাবে উপস্থাপন করে।