পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া একটি পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মাইল নিচে অবস্থিত বহিঃকেন্দ্র বা Outer Core-এর গলিত লোহার একটি বিশাল প্রবাহ গত এক দশকে নিজের চলার দিক আংশিকভাবে পরিবর্তন করেছে। এই পর্যবেক্ষণ পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা এবং চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিদ্যমান ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করছে।
পৃথিবীর সুরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত এই প্রবাহ
পৃথিবীর Outer Core মূলত গলিত লোহা ও ধাতব উপাদানে গঠিত। এই তরল ধাতুর অবিরাম সঞ্চালনের ফলেই পৃথিবীর চারপাশে একটি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। এই চৌম্বকক্ষেত্র সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর বিকিরণ এবং মহাজাগতিক কণার বিরুদ্ধে পৃথিবীর জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যন্তরীণ প্রবাহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে অবস্থিত গলিত লোহার একটি বৃহৎ স্রোত ২০১০ সালের দিকে তার পূর্বের পশ্চিমমুখী প্রবাহ পরিবর্তন করে পূর্বদিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
গবেষকদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবর্তন
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত University of Edinburgh-এর School of Geosciences-এর বিজ্ঞানী Frederik Dahl Madsen বলেছেন, এত বড় আকারের একটি প্রবাহের বিপরীতমুখী হয়ে যাওয়া পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরের আচরণ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না এই পরিবর্তনটি সাময়িক কোনো ওঠানামা কি না। এটি হয়তো দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রাকৃতিক চক্রের অংশ হতে পারে, আবার পৃথিবীর কেন্দ্রের সঞ্চালন ব্যবস্থায় নতুন ধরনের ভারসাম্যের ইঙ্গিতও দিতে পারে। এই সম্ভাবনাগুলো যাচাই করতে আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে।
প্রচলিত ধারণার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
European Space Agency-এর বিজ্ঞানী Elisabetta Yorfida জানিয়েছেন, এ ধরনের পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী কিছু ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এতদিন ধারণা করা হতো যে পৃথিবীর Outer Core-এ বৃহৎ আকারের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পশ্চিমমুখী ধারা অনুসরণ করে। কিন্তু নতুন গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে, মাত্র এক দশকের মধ্যেই পৃথিবীর গভীরে উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।
গবেষকদের মতে, এটি পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে আরও ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে যা দেখা গেছে
European Space Agency-এর তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে পূর্বমুখী এই প্রবাহ তার সর্বোচ্চ সক্রিয় অবস্থায় পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে এর শক্তি কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে।
এই প্রবণতা থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ঘটনাটি হয়তো পৃথিবীর কেন্দ্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক দোলন বা চক্রাকার পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
মানুষের জন্য কি কোনো ঝুঁকি রয়েছে?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের ফলে মানবজাতি বা বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর তাৎক্ষণিক কোনো সরাসরি ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। কারণ ঘটনাটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে অত্যন্ত গভীরে সংঘটিত হচ্ছে এবং এর প্রভাব সরাসরি অনুভূত হওয়ার মতো নয়।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র কীভাবে তৈরি হয় এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই ধরনের গবেষণা মৌলিক গুরুত্ব বহন করে।
চৌম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ
পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র স্থির নয়; এটি সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে গভীর অভ্যন্তরে থাকা গলিত ধাতুর প্রবাহের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
আধুনিক বিশ্বে চৌম্বকক্ষেত্রের আচরণ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি যোগাযোগব্যবস্থা, Navigation System, মহাকাশযানের কার্যক্রম এবং Space Weather সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
Apple Pay : বাংলাদেশে ব্যবহারের উপায়, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চিত্র
পৃথিবীর গভীরে গলিত লোহার বিশাল প্রবাহের দিক পরিবর্তনের এই পর্যবেক্ষণ তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণ না হলেও বিজ্ঞানীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং এর চৌম্বক সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পেতে ভবিষ্যতে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Discover more from Priyo Bangla 24 - Most Popular Bangla News
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
Priyo Bangla 24 – Most Popular Bangla News The Fastest Growing Bangla News Portal Titled Priyo Bangla 24 Offers To Know Latest National And Local Stories.
