Mas

ছাত্রদের পাশে কেন ছিলেন না অবিশ্বাস্য কারণ জানালেন মাশরাফী

একটা সময় ছিল যখন মাশরাফি বলতে পাগল ছিল সবাই। তার নামে গোটা গ্যালারি ফাটিয়ে দিত ভক্ত সমর্থকরা। তিনিই এক সময় ছিলেন মাহানায়ক। এখন হয়ে গেছেন মার্ভেল মভির সবচেয়ে বড় ভিলেন থ্যানোসের মত ভক্তদের কাছে। কোটা আন্দোলনের সময় চুপ থাকা, দলের উর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে থাকতে না পারার ব্যাপারটি তুমুল আলোচনা সমালোচনা জন্ম দেয়।

এর ফলশ্রুতিতে পুড়িয়ে দেয়া হয় তার বাড়ি। তবে এবার সব কিছু নিয়ে নিরবতা ভেঙেছেন মাশরাফি। দেশের একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সব কিছু পরিস্কার করেছেন।

কোথায় আছেন, কেমন আছেন?

মাশরাফি বিন মুর্তজা: শারীরিকভাবে ঠিক আছি। মানসিকভাবে অবশ্যই ভালো অবস্থায় নেই। আছি আর কী। ঢাকাতেই আছি, পরিবারের সঙ্গে।

এতদিন চুপ ছিলেন, আজ কথা বলতে রাজি হয়েছেন। গত এক মাসে দেশে এই যে এত কিছু হলো, এত বড় আন্দোলন, এত প্রাণহানি, এত রক্তপাত, সরকারের পরিবর্তন… সবকিছুতে পেছন ফিরে তাকালে ব্যক্তিগতভাবে আপনার এখন কি মনে হয়?

মাশরাফি: এই কষ্ট থাকবেই। হয়তো আজীবন থাকবে। দেশের একটা ক্রাইসিস মুহূর্তে পাশে থাকতে পারিনি, কিছু করতে পারিনি, এটা আমাকে সবসময়ই ভোগাবে, পোড়াবে। সবসময়ই থেকে যাবে।

সবসময় সব কথা বলা যায় না। কিছু জিনিস হয়তো বলার ব্যাপারও নয়। এতদিন চুপ ছিলাম। আজকে কিছু বলছি। কিছু হয়তো সামনে বলব। জীবনে অনেক কিছু হবে। তবে এই কষ্টটা রয়ে যাবে। যত কিছুই হোক, এটা কখনও যাবে না। নিজের ওপর সেই হতাশা সবসময়ই থাকবে।

তাহলে চুপ ছিলেন কেন?

মাশরাফি : এখন আসলে এসব কথার উত্তর বা ব্যাখ্যা দেওয়ার অর্থ নেই। যদি সরাসরি বলি, তাহলে অবশ্যই আমি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি অনেক মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে।

কথা যদি বলতেই হতো তখন… কোটা সংস্করারের আন্দোলন অবশ্যই যৌক্তিক ছিল। আমার নিজের কাছেও মনে হচ্ছিল, এটা হয়ে যাবে। তবে সবাই যখন চাচ্ছিল যে আমি কিছু একটা বলি বা স্ট্যাটাস দেই (ফেইসবুকে)… ততক্ষণে আসলে সবকিছু এত দ্রুত হচ্ছিল… ভাবছিলাম যে আমি যদি কিছু লিখি বা মন্তব্য করি, সেটার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে… অনেক কিছু ভাবছিলাম আর কী… সব মিলিয়ে কিছু লেখা হয়নি।

আমি কিছু করার চেষ্টা করিনি, তা নয়। আমি শুধু কিছু লেখার ভাবনায় থাকতে চাইনি। চেয়েছিলাম ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে, আলোচনার মাধ্যমে কিছু করা যায় কি না। সেই শুরুর দিকেই চেষ্টা করেছি। কারণ তাদের দাবি আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। কিন্তু সেটাও করতে পারিনি। সব মিলিয়ে অবশ্যই ব্যর্থ হয়েছি।

আপনার চেষ্টা করার দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে না পারার কারণ কি? আপনাকে করতে দেওয়া হয়নি?

মাশরাফি: দেখুন, আমি ছোট থেকে ক্রিকেট খেলেছি, একসময় জাতীয় দলে এসেছি, পরে অধিনায়ক হয়েছি। অধিনায়ক থাকার সময় দল যখন হেরেছে বা খারাপ করেছে, সেটার দায় আমাকে নিতে হয়েছি। আমি সবসময়ই নিয়েছি। আপনারা যদি মনে করতে পারেন, ম্যাচ হারলে অধিনায়ক হিসেবে আমি দায় নিয়েছি। কিন্তু রাজনীতির আঙিনা তো ভিন্ন।

রাজনীতির মাঠে আমি আমার দলের অধিনায়ক নই। সহ-অধিনায়ক নই। এমনকি, বড় কেউ নই। মাত্র কয়েক বছর হলো শুরু করেছি রাজনীতি। আমি আমার জায়গা থেকেই চেষ্টা করেছি। যতটুকু সাধ্য ছিল, চেষ্টা করেছি যেন ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারি। কিন্তু সুযোগটা না পেলে তো কিছু করার থাকে না। হয়তো দলের উপদেষ্টামন্ডলিতে থাকলে বা সেরকম কেউ হলে দায়িত্ব পেতাম। তার পরও সাধ্যমতো করেছি, কিন্তু সুযোগটা আমি পাইনি।

তার পরও কাউকে দোষ দেব না। দায় আমারই। বিশেষ করে, মানুষের যে আবেগ-ভালোবাসার জায়গা ছিল, ক্রিকেটার মাশরাফির প্রতি যে দাবি ছিল, সেটা পূরণ করতে পারিনি এবং সেই দায় মাথাপেতেই নিচ্ছি। আমি ব্যর্থ হয়েছি এবং সেটা আমাকে সেই শুরু থেকেই পোড়াচ্ছে। রাজনীতিবিদ হিসেবে, আমি কিছু করার চেষ্টা করেছি। পারিনি।

অনেকের প্রত্যাশা ছিল, আপনি দলীয় আবরণের বাইরে গিয়ে কিছু বলবেন বা করবেন…

মাশরাফি: দলের বাইরে গিয়ে কিছু করতে হলে আমাকে পদত্যাগ করতে হতো। সেটা যদি করতাম, তাহলে এখন নিশ্চয়ই আমার অনেক প্রশংসা হতো। কিন্তু প্রতিটি সময়ের বাস্তবতা আলাদা থাকে। ওই সময় যদি পদত্যাগ করতাম, তাহলে আরও বড় কিছু হয় কি না, বা পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় কি না, এরকম অনেক কিছু ভাবতে হয়েছে। আমি যদি সেই ভাবনাগুলি সব তুলে ধরি, সেটারও পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি থাকবে। কিন্তু সম্ভাব্য পরিণতি বা অনেক দিক ভাবতে হয়েছে আমাকে।

নড়াইলের মানুষের কাছেও আমার দায়বদ্ধতার ব্যাপার ছিল। নড়াইল-২ আসনের মানুষের অনেক আশা আমাকে ঘিরে। তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, নড়াইলকে একটা জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব। সেই মানুষগুলোর কাছে কি জবাব দেব? এরকম নানা কিছু ভাবতে হয়েছে।

অনেকেই আমাকে তখন বলেছেন, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলেও দেশের মানুষ খুশি হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আমার দায়িত্বটা আরও বেশি। আমি যদি ছাত্রদের কাছে যেতে পারতাম, তাহলে হয়তো এটা সমাধান করা বা কিছু করার সুযোগ থাকত। ছাত্ররা যদি আমার আহবানে সাড়া না দিত বা আমাকে গুরুত্ব না দিত, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু নিজের কাছে অন্তত পরিষ্কার থাকতে পারতাম যে, কিছু করার উদ্যোগ নিয়েছি। সেটা চেষ্টা করেও পারিনি। আগেই বলেছি, ব্যর্থ হয়েছি এবং দায় নিচ্ছি।


Discover more from Priyo Bangla 24 - Most Popular Bangla News

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About প্রিয় বাংলা ২৪

প্রিয় বাংলা ২৪ একটি দ্রুত বর্ধনশীল বাংলা নিউজ পোর্টাল, যা জাতীয় ও স্থানীয় সর্বশেষ খবর, প্রযুক্তি বিষয়ক টিপস এবং শিক্ষামূলক কনটেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ ও তথ্য সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং পাঠকবান্ধবভাবে উপস্থাপন করে।